সাদকাতুল ফিতর টাকা না খাদ্য দ্রব্য দিয়ে প্রদান করা উত্তম।
হয়রত আবু সাঈদ খুদরী (রা:) বলেন,
আমরা-নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে যাকাতুল ফিতর প্রদান করতাম এক সা খাদ্য দ্রব্য কিংবা এক সা যব কিংবা এক সা খেজুর কিংবা এক সা পনীর কিংবা এক সা কিশমিশ এর মাধ্যমে।
এই হাদীসে খেজুর ও যব ছাড়া আরও যে কয়েকটি বস্তুর নাম পাওয়া গেল তা হল; কিশমিশ, পনীর এবং খাদ্য দ্রব্য। উল্লেখ থাকে যে, নবীজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর ইন্তেকালের পরে হযরত মুআবীয়া (রাযিঃ)-এর খেলাফতে অনেকে গম দ্বারাও ফিতরা আদায় করতেন। সাহাবী আবু সাঈদ খুদরী (রাযিঃ) এর বর্ণিত হাদিস থেকে খাদ্য দ্রব্য দিয়ে ফিতরা প্রদানের কথাও জানা যায়। যেহেতু চাল বাংলাদেশ সহ ভারতীয় উপমহাদেশের প্রধান খাদ্য, সেহেতু চাল দিয়েও ফিতরা প্রদান করা যাবে। চালের বদলে ধান দিয়ে ফিতরা দিতে হলে, ওজনের ব্যাপারটা সবথেকে বেশি মাথায় রাখতে হবে। কারণ এক সা ধান কখনো এক সা চালের সম মূল্যের হবে না। কুরআন থেকে জানা যায়ঃ
‘‘তোমরা খাদ্যের নিকৃষ্ট অংশ দ্বারা আল্লাহর পথে খরচ করার সংকল্প করো না। অথচ তোমরা স্বয়ং উহা গ্রহণ করতে প্রস্তুত নও।’’ (আল-কোরআন)
তবে ধানের থেকে চাল দিয়ে ফিতরা প্রদান করা উত্তম। নিম্নোক্ত কিয়াস থেকে এই ব্যাপারে ধারণা পাওয়া যায়-
যবের উপর কেয়াস (অনুমান) খাটিয়ে ধানের ফিতরা জায়েয হবে না, কারণ ধান আদৌ আহার্য সামগ্রী নয়। উপমহাদেশীয়দের জন্য এক সা চাল দিতে হবে এবং ফিতরা আদায়ে তাহাই উত্তম।
প্রত্যেক মুসলিম ভাইকে জানা দরকার যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগে মুদ্রা হিসেবে দীনার এবং দিরহামের প্রচলন ছিল। এবং সে কালেও ফকীর ও মিসকিনদের তা প্রয়োজন হত। তা দ্বারা তারা জিনিস-পত্র ক্রয়-বিক্রয় করত। তা সত্ত্বেও নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুদ্রা দ্বারা ফিতরা নির্ধারণ না করে খাদ্য দ্রব্য দ্বারা নির্ধারণ করেছেন। তাই উপরে হাদীসে বর্ণিত খাদ্য বস্তু দ্বারাই ফিতরা আদায় করা সুন্নত। আর এটাই জমহুর (অধিকাংশ) উলামায়ে কেরামের মত। কারণ বর্ণিত খাদ্য বস্তুর বদলে মূল্য তথা টাকা-পয়সা দ্বারা ফিতরা দিলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আদেশকে উপেক্ষা করা হয়।
যারা মূল্য দ্বারা ফিতরা দেয় তাদের সম্পর্কে ইমাম আহমদ (রহঃ) কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নতের বরখেলাফ হওয়ার কারণে আমার আশংকা হচ্ছে যে, তা যথেষ্ট হবে না। [মুগনী, ইবনু কুদামাহ, ৪/২৯৫]
মূল্য দ্বারা ফিতরা দিতে গেলে আরও একটি বড় বিড়ম্বনার সম্মুখীন হতে হয়। তা হল, প্রতি বছর প্রতি অঞ্চলে এমন একদল লোকের প্রয়োজন আছে যারা ফিতরার মূল্য নির্ধারণ করে সাধারণ লোকদের জানাবে। কারণ স্থান ও কালের ভেদে দ্রব্যের মূল্য কম-বেশী হতে থাকে। তাই প্রতি বছর ফিতরার মূল্য নির্ধারণ করার প্রয়োজন হয়, প্রায় পনেরশ বছর পূর্বে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পরিমাণ নির্ধারণ করে গেছেন। মানুষ এত সব করতে ইচ্ছুক কিন্তু যা কিছু দ্বারা নবীজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ফিতরা দিয়ে গেছেন তা দ্বারা ফিতরা দিতে অনিচ্ছুক! কি আশ্চর্য!!
অপরপক্ষে ইমাম আবু হানিফা, সুফিয়ান সাওরী, আতা, হাসান বাসরী, ওমর বিন আব্দুল আজিজ প্রমুখের মতে, নগদ অর্থ দিয়ে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা বৈধ। কেননা সাদাকাতুল ফিতর আদায়ের একটি অন্যতম লক্ষ্য হলো দরিদ্র মানুষকে ঈদের আনন্দে শরীক হওয়ার সুযোগ করে দেয়া। দরিদ্র মানুষের যেমন প্রয়োজন খাদ্যের, তেমনি প্রয়োজন কাপড়-চোপড় ও অন্যান্য সামগ্রীর। সকলেই যদি শুধু খাদ্য দিয়ে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করে, তাহলে হয়তো তার ঘরে জমা হয়ে যাবে অঢেল খাদ্য। অথচ তার এত খাবারের প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন তার কাপড়-চোপড়, সেমাই, চিনি ও অন্যান্য সামগ্রী। এ অবস্থায় তার প্রয়োজন পূরণের জন্য তাকে অতিরিক্ত খাবার বিক্রি করতে হবে। এতে যেমন রয়েছে বিক্রি করার বিড়ম্বনা, তেমনি বিক্রি করতে হবে তুলনামূলক কম মূল্যে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দরিদ্র মানুষটি।
মধ্যমপন্থা অবলম্বনকারী আলেমদের অভিমত হচ্ছে- খাদ্যবস্তু দ্বারা ফিতরা আদায় করলে তা হবে সুন্নাহ সম্মত। খাদ্যবস্তু বলতে তারা বুঝিয়ে থাকেন সমাজে যেসকল খাদ্যের প্রচলন আছে এমন খাদ্য দিয়ে দেয়া উত্তম। যেমন কেউ যদি ঈদের আগে ফিতরার পরিমাণ হিসাব করে ঐ টাকা দিয়ে সেমাই, দুধ, চাল, চিনি, গোশত ইত্যাদি একত্র করে কোনো গরীব পরিবারকে দেয়। যেন ঈদের দিন তারা একটু ভাল খাবার খেতে পারে। তাহলে তা সবচেয়ে উত্তম ও সুন্নাহ সম্মত হবে। কিন্তু যদি কেউ খাদ্য না দিতে পারে, বরং টাকা দেয়। তাহলেও তা আদায় হয়ে যাবে। টাকা দিয়ে আদায় করাকে তারা জায়েজ বলেছেন। হয়ত পুরোপুরি সুন্নাহের অনুসরণ হলো না। কিন্তু ফিতরার মূল লক্ষ্য অর্জিত হওয়ায় এটাকে বাতিল বলা যাবে না। তাই আমাদের উচিত সর্বোচ্চ চেষ্টা করা খাদ্যদ্রব্য দিয়ে ফিতরা আদায় করা। অন্যথায় নিরুপায় হলে টাকা দিয়ে আদায় করা।

Comments
Post a Comment